বিপুন ভট্টাচার্য, বর্ধমান: গত বৃহস্পতিবার থেকে পূর্ব বর্ধমান জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল আর বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে টানা ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ করেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। কয়েকদিন পূর্ব বর্ধমানেই থেকে হাসপাতালগুলির চিকিৎসা পরিষেবা, রোগীদের খাবার, পরিকাঠামো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা ও দালালচক্রের পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন। রবিবার সেই পরিদর্শনের ভিত্তিতে তিনি পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের সভাগৃহে পুলিশ-প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিক, ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে পর্যালোচনা বৈঠক করেন। হিলেন রাজ্যের শিল্প প্রতিমন্ত্রী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র। বৈঠক শেষে সাংবাদিক বৈঠকে একাথিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও নতুন নিয়ম চালুর কথা জানান শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। সরকারি হাসপাতালের রোগীদের খাবারের মান ও পরিবেশন ব্যবস্থার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব...
বিপুন ভট্টাচার্য, বর্ধমান: গত বৃহস্পতিবার থেকে পূর্ব বর্ধমান জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল আর বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে টানা ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ করেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। কয়েকদিন পূর্ব বর্ধমানেই থেকে হাসপাতালগুলির চিকিৎসা পরিষেবা, রোগীদের খাবার, পরিকাঠামো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা ও দালালচক্রের পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন। রবিবার সেই পরিদর্শনের ভিত্তিতে তিনি পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের সভাগৃহে পুলিশ-প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিক, ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে পর্যালোচনা বৈঠক করেন। হিলেন রাজ্যের শিল্প প্রতিমন্ত্রী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র। বৈঠক শেষে সাংবাদিক বৈঠকে একাথিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও নতুন নিয়ম চালুর কথা জানান শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। সরকারি হাসপাতালের রোগীদের খাবারের মান ও পরিবেশন ব্যবস্থার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকারি হাসপাতালে রোগীদের খাবারের জন্য বরাদ্দ মাথাপিছু ৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১১ টাকা করেছেন, অর্থাৎ আগের চেয়ে বরাদ্দ দ্বিগুণ হয়েছে। সেই অনুযায়ী রোগীরা পর্যাপ্ত আর মানসম্মত খাবার পাচ্ছেন কিনা, তা দেখতে
শধু বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ আর কালনা হাসপাতালে রান্না থেকে পরিবেশন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখি। রোগীদের সঙ্গেও কথা বলি। খাবারের মান আগের চেয়ে অনেকটাই উন্নত হয়েছে। তবে ডালের পরিমাণ আর গুণমান নিয়ে এখনো অসন্তোষ রয়েছে। মন্ত্রীর কথায়, পরিমাণ বাড়ানো সহজ হলেও ডালের গুণমানের দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। খাবার পরিবেশনের পদ্ধতি নিয়েও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছি। একই পাত্রে ভাত, ডাল, তরকারি, মাহ সব একসঙ্গে দেওয়ার বদলে আলাদা খোপযুক্ত স্টিলের কম্পার্টমেন্টাল ফুড ডিশ ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছি। এতে খাবারের পরিমাণ নজরে রাখা যেমন সহজ হবে, তেমনই রোগীদের খেতেও সুবিধা হবে। ডিসপোজেবল পাত্র নয়, স্টিলের পাত্র ব্যবহারের কথাই বলা হয়েছে। এ নিয়ে কলকাতার ফিরে সোমবার সংশ্লিষ্ট ভেন্ডর ও কেটারিং সংস্থাগুলির সঙ্গে আলোচনা করে ১টি ‘ফুলপ্রুফ’ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে ‘সরকারি হাসপাতালে ভরতি হওয়ার পর রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে স্বাস্থ্যসাথী বা আয়ুষ্মান ভারত-সহ সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের সুবিধায় অস্ত্রোপচার করানোর প্রবণতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে ভরতি হয়ে রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, সিটিস্ক্যান-সহ বিভিন্ন পরিষেবা নেওয়ার পর শেষ মুহুর্তে রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতা বন্ধ করতে নতুন নিয়ম তৈরি করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে ভরতি হওয়ার পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে স্বাস্থ্যসাথী বা আয়ুষ্মান ভারত কার্ডের মাধ্যমে বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা যাবে না। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদেরও এ ব্যাপারে নজরে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হবে। তবে নগদ টাকায় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।’ হাসপাতালে একই বেডে একাধিক রোগী বা রোগীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় পরিবারের সদস্য থাকার প্রবণতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্ধমানের কিছু হাসপাতালে একই বেডে মা-মেয়ে বা বাবা-হেলের থাকার ঘটনা প্রায় পরিচিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই সদ্য অস্ত্রোপচার হওয়া, সিজারিয়ান রোগী, নল লাগানো রোগী-সহ বিশেষ প্রয়োজনীয় কিছু ক্ষেত্র হাড়া রোগীর সঙ্গে পরিবারের লোকদের থাকার অনুমতি সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী নার্সিং স্টাফরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্দিষ্ট অ্যাটেনডেন্টকে থাকার অনুমতি দিতে পারবেন।’ পরিবারের লোকদের সরিয়ে দিলে রোগীদের
দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ‘প্রয়োজনে ওয়ার্ডভিত্তিক অ্যাটেনডেন্ট বা গ্রুপ-ডি কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো হবে। স্থানীয়ভাবে কর্মী নিয়োগ করে প্রতিটি ওয়ার্ডে এমন কর্মী রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যাঁরা রোগীকে শৌচালয়ে নিয়ে যাওয়া বা প্রয়োজনীয় সহায়তার কাজ করবেন।’ হাসপাতালের দেওয়ালে লেখা বা পোস্টার লাগিয়ে প্রতিবাদ করার বদলে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের প্রাঙ্গণে ২টি পৃথক ‘প্রতিবাদী দেওয়াল’ তৈরির সিদ্ধান্তের কথা জানান শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘হাত্রহাত্রী ও ছাত্র সংগঠনের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজের দেওয়াল নোংরা না করে নির্দিষ্ট জায়গার প্রতিবাদী লেখা, ছবি বা বার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে হাসপাতাল চত্বরে এমন ২টি বড়ো দেওয়াল তৈরি করা হবে, যা হাসপাতালে ঢোকার সময় সাধারণ মানুষেরও নজরে পড়বে। সেই দেওয়ালের নাম ‘অভয়ার স্মৃতিতে’, ‘প্রতিবাদের দেওয়াল’ বা অন্য কিছুরাখা হবে কিনা, তা পড়ুয়ারাই ঠিক করতে পারবেন।’ অভয়া’র বিচার নিয়েও এদিন ফের রাজ্য সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ‘স্বাস্থ্য দফতর ও রাজ্য সরকার এই ঘটনার বিচার নিয়ে প্রতিশ্রুতিদ্ধ। এদিনই অভয়ার মা রমা দেবনাথের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যতদিন না বিচার হচ্ছে, ততদিন এই বিষয়টি ভুলে যাওয়ার প্রশ্ন নেই।’ অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা নিয়ে নতুন নিয়ম তৈরির কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘৩ ধরনের অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা নির্ধারণ করা হবে- সাধারণ পরিবহণ অ্যাম্বুল্যান্স, অক্সিজেন ও সাকশন-সহ প্রাথমিক চিকিৎসা পরিকাঠামোর অ্যাম্বুল্যান্স আর আইসিইউ সুবিধাযুক্ত অ্যাম্বুল্যান্স। তিন ধরনের পরিষেবার জন্য আলাদা ভাড়ার কাঠামো তৈরি হবে। পূর্ব বর্ধমানের স্থানীয় রাস্তা, দূরত্ব আর পরিবহণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভাড়া ঠিক করার দায়িত্ব জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। কলকাতা যাওয়া ও ফিরে আসার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ভাড়ার কাঠামো তৈরি হবে। রোগীর পরিবার ও অ্যাম্বুল্যান্স চালকের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে অ্যাপ-ভিত্তিক অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অ্যাপের মাধ্যমে পরিষেবা বুক করা গেলে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কমবে। তবে এই ব্যবস্থা নভেম্বরের আগে চালু করা সম্ভব হবে না। পূর্ব বর্ধমানের প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে মোবাইল মেডিকেল ইউনিট বা তক্তা-র সংখ্যা ও পরিকাঠামো হবে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি মেটাতে মোবাইল ইউনিটে প্রয়োজনীয় যন্ত্র পৌঁছে দেওয়া হবে। হ্যান্ডহেল্ড বা ডিজিটাল এক্স-রে, ইউএসজি, সেমি-অটো অ্যানালাইজার আর ইসিজি-সহ প্রয়োজনীয় বস্ত্র থাকবে এই ইউনিটগুলিতে। চিকিৎসক ও নার্সিং স্টাফও থাকবেন। এরমধ্যেই চারটি পূর্ণাঙ্গ মোবাইল মেডিকেল ইউনিট পরিষেবা দেওয়ার মতো পরিকাঠামো নিয়ে এসেছে। প্রতিটি ইউনিটে এক্স-রে, ইউএসজি, রক্ত পরীক্ষার যন্ত্র, ইসিজি, চিকিৎসক ও নার্সিং স্টাফ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দিনের বেলায় প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পরিষেবা দেওয়ার পর সন্ধ্যায় সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফিরে এসে পরিষেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে একই মোবাইল ইউনিট থেকে প্রত্যন্ত এলাকার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘টানা কয়েকদিনের পরিদর্শনে সরকারি হাসপাতালের যেসব সমস্যা সামনে এসেছে, সেগুলি চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রোগীর পরিষেবা, হাসপাতালের পরিকাঠামো আর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। এই কদিনের পরিদর্শনের সময় ৪ জনকে সতর্কও করা হয়েছে।’